বিশেষ প্রতিনিধি জাফলং থেকে ফিরে :
গোয়াইনঘাটের জাফলং সীমান্ত দিয়ে দীর্ঘদিন থেকে ভারত থেকে আসছে অবৈধ মাদক, বিভিন্ন রকম অস্ত্র, কসমেটিকস, কম্বল, জিরা, কিট, চিনি, মটর সাইকেলসহ নানা রকম অবৈধ পণ্য। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান ছাড়া দৃশ্যমান কিছুই করতে পারেনা প্রশাসন। যদিও এসব চোরাচালান বন্ধ করতে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজি বারবার দিচ্ছেন কঠোর নির্দেশনা।সিলেটের নবাগত পুলিশ সুপার চোরাচালান বন্ধে সাংবাদিকদের শুনিয়েছেন আশারবাণী। স্থানীয়রা বলছেন, গোয়াইনঘাট থানায় নবাগত ওসি কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই তার নামে শুরু হয়েছে চাঁদাবাজী। নবাগত এসপির নামে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বখরার টাকার পরিমান। অথচ এসপি চোরাচালান বন্ধে বদ্ধপরিকর বলে দিয়েছেন হুশিয়ারী। এতো কিছুর পর কোন ভাবেই থামানো যাচ্ছেনা সীমান্তের চোরাচালান। বিভাগীয় চোরাচালান প্রতিরোধে টান্সফোর্সের সভায় বার-বার উঠে আসছে জাফলং সীমান্তের চোরাচালানের বিষয়টি। পুলিশের খাতায় সীমান্তের চোরাকারবারিদের গডফাদার এখন মান্নান মেম্বার। যিনি অপ্রতিরোধ্য এক চোরাচালানের লাইনম্যান। মান্নান এবার চোরাকারবারিদের বলছেন, বর্তমান ওসির কাছ থেকে লাইন নিতে তার ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কারণ সেই টাকা উপর মহলে দিতে হচ্ছে। তাই আগের পরিমান টাকা দিলে হবে। এবার চোরাচালানের পন্য আনতে হলে লাইনের জন্য বেশী টাকা দিতে হবে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাফলং জিরোপয়েন্ট বিজিবির ক্যাম্পের পাশেই প্রতিদিন মান্নান মেম্বারের নেতৃত্বে বসছে ভারতীয় চোরাচালান পণ্য বিক্রির হাট। যেটি এখন ভারতীয় কম্বলের হাট হিসাবে পরিচিত। এই হাট থেকে মান্নান মেম্বার গোয়াইনঘাট থানার ওসি জেলা উত্তর ডিবির ওসি নামে লাখ টাকা বখরা তুলছেন বলে সরেজমিন ব্যবসায়ীরা জানান। তাদের ভাষায়, মান্নান ম্যানেজ মানে পুলিশ ডিবি-বিজিবি ম্যানেজ। সম্প্রতি এসব চোরাইহাটের সংবাদ প্রকাশ হলে গত ২১ ডিসেম্বর রবিবার সকালে অভিযান চালায় স্থানীয় বিজিবি। অথচ বিজির ক্যাম্প ঘিরেই মান্নান মেম্বারে চোরাইপন্যর তিনটি দোকান। সেই অভিযানের আগের রাতেই খবর পৌঁছে যায় চোরাকারবারিদের কাছে। ফলে চোরাকারবারিরা সে দিন আগেই সরিয়ে ফেলে তাদের চোরাচালানের মালামাল। ফলে বিফল হয় বিজিবির লোক দেখানো অভিযানটি। অথ বিজিবি ক্যাম্পের পাশেই মান্নান মেম্বারের ভাইদের ৩ টি ভারতীয় চোরাই মালের দোকান ও গোডাউন। সেটি চুখে দেখেনা বিজিবি-ডিবি- কিংবা থানার পুলিশ। এমনকি টান্সফোর্সের সদস্যদের চোখে পড়েনা এসব চোরাইহাট। স্থানীয়দের প্রশ্ন সীমান্তের চোরচালানের গডফাদার কে থামাবে কে? সম্প্রতি অনুসন্ধানকালে দেখা যায়, গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং লালমাটি পর্যটন কেন্দ্রের একটি দোকানে মধ্যরাতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে কম্বল নিয়ে প্রবেশ করছেন এক যুবক। সীমান্ত অতিক্রম করে মাথায় কম্বলের গাট্টিটি নিয়ে যুবকটি লালমাটি এলাকার মান্নান মেম্বারের ভাই লোকমানের দোকানে ঢুকছেন বলে স্থানীয়রা নিশ্চিত করেন। ভাইরাল ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর সীমান্ত এলাকার চোরাচালানের বিষয়টি আবারও প্রকাশ্যে আসে। কারণ এর ৩/৪ দিন আগেই অবৈধ ভারতীয় কম্বলের হাটে অভিযান চালিয়ে ছিলো বিজিবি। স্থানীয়দের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা চোরাচালানের সামান্য একটি দৃশ্য এটি। এখানে প্রায় ২০/২৫ জনের একটি সঙ্গবদ্ধ চোরচালানের গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করেন জাফলং গুচ্ছগ্রামে সাদ্দাম রুহির ছেলে আব্দুল মান্নান উরফে মান্নান মেম্বার। যিনি নামে জনপ্রতিনিধি হলে বাস্তবে সীমান্তের চোরাচালানের গডফাদার হিসাবে পরিচিতি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক পলাতক মন্ত্রী ইমরান আহমদের কাছের লোক পরিচয় দিয়ে লোকজনের কাছে প্রভাব বিস্তার করতেন। এ সময় মন্ত্রীকে খুশি করতে নিজের উদ্যোগে, নিজের চোরাচালানের টাকায় পোস্টার ছাপিয়ে সেই পোষ্টার জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করতেও তাকে দেখা গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সে সময় মান্নান মেম্বার দিনের বেলা ইউনিয়নের কাজ করলেও রাতের বেলা বিজিবি ও জেলা ডিবি পুলিশের কথিত লাইনম্যান হিসেবে কাজ করেন। লালমাটি ও আশপাশের সীমান্ত এলাকা দিয়ে কেউ অবৈধভাবে পণ্য আনা-নেওয়া করলে তাকে চাঁদা না দিলে বিজিবি কিংবা ডিবির মাধ্যমে সেই পণ্য আটক করে নিজের গোদামে নিয়ে যেতেন। আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তন হলেও থেমে থাকেননি মান্নান মেম্বার। খোলস বদল করে এবার তিনি বিএনপির ঘরোনার লোক পরিচয় দিয়ে নতুন করে লাইনম্যান হয়েছেন। চলছে তার বখরা আর চাঁদাবাজিসহ চোরাচালান বাণিজ্য। পুলিশী নজর এড়াতে বরং সময়ের সঙ্গে কৌশল বদলেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে তিনি আড়ালে চলে গেছেন। বর্তমানে রাতের অন্ধকার কিংবা দিনের সুযোগে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পণ্য আসলেও তিনি সরাসরি চাঁদা আদায় না করে নিজের তৈরি করা একাধিক বিশ্বস্থ্য বাহিনীর লোক নিয়োক করেছেন। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, জাফলং সীমান্তের প্রায় ২৫ টি পয়েন্টের চোরাচালান নিয়ন্ত্রন করেন মান্নান। পুলিশ ও ডিবির লাইনম্যান পরিচয়ে তুলেন বখরা। এদিকে বিজিবি, পুলিশ ও ডিবি ম্যানেজ করে মান্নানের হাত ধরেই দেশে আসছে অবৈধ অস্ত্র, মাদক, কম্বলসহ নানা রকম পন্য। এ দিকে মান্নানের চোরাচালানের সংবাদ প্রকাশ বন্ধ রাখতে বিভিন্ন ভাবে তদবির শুরু করেন মান্নান মেম্বার। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে ম্যানেজ করতে না পেরে, নিজের লোক দিয়ে ভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ করলেও থেমে নেই চোরাচালান বাণিজ্য। এদিকে মান্নানদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদসহ দীর্ঘ দিন থেকে চলে আসা চোরাচালানের সংবাদ যাতে কোন মিডিয়ায় প্রকাশ না পায় সে জন্য সংবাদ বন্ধের ঠিকাদারী নিয়েছেন কয়েকজন। এদিকে সবদিকে ব্যার্থ হয়ে মান্নান হুমকি দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে আর সংবাদ প্রকাশ হলে, তিনি সেই পত্রিকা অফিস আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিবেন। এছাড়া তিনি মামলা দায়ের করবেন বলে সুস্যাল মিডিয়ায় হুমকি দেন। কিন্তু বিধিবাম অনুসন্ধানে গেলে, মান্নানের নেতৃত্বে তার ভাই লোকমানের দোকানে ভারতীয় কম্বল নিয়ে আসার ভিডিও ধারণ করেন সাংবাদিকরা। যা এখন সুস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পাচ্ছে। আর স্থানীয় সাংবাদিকদের বরাত দিয়ে কম্বল হাটের ছবি এখন শুভাপাচ্ছে সুস্যাল মিডিয়ায়। এদিকে জাফলং চোরাকারবারিদের গডফাদার আব্দুল মান্নান উরফে মান্নান মেম্বার নিজের অপরাধ ঢাকতে কতিপয় কিছু সাংবাদিকদের দিয়ে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রতিবাদ ছাপিয়ে নিজেকে ধোঁয়া তুলসিপাতা দাবী করায়, হতবাক স্থানীয় লোকজন। একজন চোরাকারবারি নিজে পুলিশের লাইনম্যান হয়ে টাকা উত্তোলন করছে। সরেজমিন পরিদর্শন করলে মান্নান মেম্বারের চোরাচালানের বিষয়ের শতভাগ প্রমান পাওয়া যাবে। জাফলং বিজিবি ক্যাম্পের পাশেই চলছে ভারতীয় পণ্যের বাণিজ্য! স্থানীয় গুচ্ছগ্রামের বাসিন্ধা সাদ্দাম রুহির ছেলে আব্দুল মান্নান উরফে মেম্বার মন্নানের দুই ভাই পরিচালনা করছেন তিনটি কসমেটিকসের দোকান। তাদের দোকানে প্রবেশ করলেই দেখা যায় অধিকাংশ পণ্যই ভারতীয়। অভিযোগ রয়েছে, দোকানে অবৈধ পণ্য মজুত থাকলেও কোনো অভিযান হয় না সেখানে। প্রতিরাতেই সিলেট সীমান্তে বিজিবির সামনেই নামছে চোরাচালানের পন্য। এসব চোরাচালানে শুধু ভারতীয় পণ্যই থাকছে না, আসছে অস্ত্র ও নিষিদ্ধ মাদক। কয়েকদিন আগে এরকম একটি অস্ত্রের চালান পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে বিজিবি। তামাবিল, সোনাটিলা, স্থলবন্দর, নলজুড়ি, বল্লাঘাট জিরো পয়েন্ট, আমস্বপ্ন ও তালতলা, লালমাটি, নলজুরি সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে ভারতীয় পণ্যের চোরাচালান। লালমাটি, সংগ্রাম বিজিবি ক্যাম্প, বিজিবি ক্যান্টিন, সাইনবোর্ড, আমতলা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে আব্দুল মান্নান উরফে মান্নান মেম্বার। চোরকারবারি মান্নান এখন ভারত থেকে নিয়ে আসছে কম্বল, নানারকম মাদক সহ অবৈধঅস্ত্র। যা রাত হলেই প্রবেশ করছে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তবে এবার মান্নান প্রকাশ্য জেলা ডিবির ওসি ও থানার ওসির লাইনম্যান হিসাবে সীমান্তের সকল চোরাচালান নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নিছেন। ভারতীয় চোরাকারবারিদের কাছ থেকে জেলা ডিবি ও থানা পুলিশের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে লাইনম্যান মান্নান মেম্বার সহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে। রাত হলে কোটি কোটি টাকার ভারতীয় অবৈধ পণ্য সামগ্রী বাংলাদেশ প্রবেশ করছে। চোরাচালান ব্যবসায়ীদের নাম প্রকাশ না করা শর্তে সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলিশ, ডিবি, বিজিবি এসব মান্নান মেম্বার ম্যানেজ করে, আমরা মান্নান মেম্বারকেক লাইনের টাকা দেই। জেলা ডিবি ও থানা পুলিশের নামে লাইনম্যান হিসেবে মান্নান মেম্বার তার লোক দিয়ে টাকা আদায় করে। উল্লেখ্য, সিলেটের স্থানীয় ও জাতীয় প্রত্রিকায় চোরাচালানের গডফাদার মান্নানের বিরুদ্ধে একাধিক সংবাদ পরিবেশন করা হলেও অদৃশ্য কারণে প্রশাসনের অ্যাকশন না নেওয়ার কারণে ক্রমেই বেপোয়ারা হয়ে উঠেছে চোরাকারবারী মান্নান বাহিনী।



















